বিশ্বের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান দুর্ভাগা

মৃ'ত্যু তার জীবনে বহু বার আসা যাওয়া করেছে। তবে ক্রোয়েশিয়ার ফ্রানে সেলাক অবশ্য প্রতি বারই মৃ'ত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবলীলায় জীবনে ফিরেছেন। যা তাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সৌভাগ্যবান দুর্ভাগা’ হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে।

ফ্রানে এক জন সঙ্গীত শিক্ষক। শারীরিক ভাবে তিনি যে দারুণ চাঙ্গা, এমনটাও নয়। এই ফ্রানে নিজের জীবনে সাত বার বড় রকমের জীবন সঙ্কটে পড়েছেন। বিমান দুর্ঘ'টনা থেকে শুরু করে গাড়ি বিস্ফোরণ, ট্রেন দুর্ঘ'টনা… কিছুই বাদ নেই সেই তালিকায়। কিন্তু দুর্ঘ'টনা যত বড়ই হোক সামান্য কা'টা ছেঁড়ার উপর দিয়েই ফ্রানের বিপদ কে'টেছে।

ফ্রানেকে ‘সৌভাগ্যবান দুর্ভাগা’ বলার দু’টি কারণ— সৌভাগ্য কেন না, প্রতিবারই তিনি নিশ্চিত মৃ'ত্যুকে এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। আর কপাল খা'রাপ কারণ, বার বার তাকে সাক্ষাৎ মৃ'ত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। ক্রোয়েশিয়াতেই ফ্রানের জন্ম ১৯২৯ সালের ১৪ জুন। এখন তিনি ৯২ বছরের বৃদ্ধ। তবে মৃ'ত্যুর সঙ্গে তার পাঞ্জা শুরু সেই ১৯৬২ সাল থেকে। তখন তার বয়স ৩২।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে সে বছরের জানুয়ারি মাসে। কনকনে ঠান্ডায় ক্রোয়েশিয়ার এক শহর থেকে অন্য শহরে সফর করছিলেন যুবক ফ্রানে। যে ট্রেনে তিনি উঠেছিলেন সেটি দুর্ঘ'টনাগ্রস্ত হয়। বেলাইন হয়ে নদীতে পড়ে যায় ট্রেনের বেশ কয়েকটি কাম'রা। ঠান্ডায় নদীর বরফ পানিতে ডুবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মা'রা যান ফ্রানের ১৭ জন সহযাত্রী। ফ্রানেও ডুবে গিয়েছিলেন। কিন্তু মোক্ষম সময়ে কেউ নদী থেকে টেনে তুলে আনে তাকে।

হাত ভেঙে গিয়েছিল। তীব্র ঠান্ডায় হাইপারথেমিয়াতেও আ'ক্রান্ত হন ফ্রানে। তবে প্রা'ণে বেঁচে যান। অবশ্য এই ঘটনা তাঁর ঘটনাবহুল জীবনের একটা ছোট্ট উদাহ'রণ। ফ্রানে তখন জানতেনও না, তার জীবনের ‘কান ঘেঁষা মৃ'ত্যু’ সিরিজের সবে প্রথম পর্ব এই ঘটনা।

পরের ঘটনাটি ঘটে পরের বছরই। ট্রেনে চড়া তখন কমিয়ে দিয়েছেন ফ্রানে। মায়ের অ'সুস্থতার খবর পেয়ে বিমানে উঠেছিলেন। আসন সংরক্ষণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার পরও কেবিন সদস্যদের পাশে বসে সফর করার অনুমতি আদায় করে ফেলেছিলেন ফ্রানে। বিমান যখন মাঝ আকাশে তখন কাজ করা বন্ধ করে দেয় দুটো ইঞ্জিন। ফ্রানে দরজার কাছে বসেছিলেন। কেবিনে বায়ুর চাপ কমে যেতেই দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায়। প্লেন থেকে ছিট'কে যান ফ্রানেও। ওই ঘটনায় বিমানের ভিতরে থাকা বাকি ১৯ জন মা'রা গিয়েছিলেন।

এ দিকে ফ্রানে, যিনি প্যারাশ্যুট ছাড়াই বিমান থেকে ছিট'কে গিয়েছিলেন, বেঁচে যান। তিনি নিজে অবশ্য ভেবেছিলেন আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ। কিন্তু আকাশ থেকে তিনি সোজা গিয়ে পড়েন একটি খড়ের গাদায়। তেমন কোনও আ'ঘাতই পাননি ফ্রানে। ঠিক এই পর্যন্ত পড়ে যদি মনে হয় এর থেকে বেশি আর কী' ঘটতে পারে, তবে বলতে হবে এখনও অনেক জানার বাকি। সবে তো জমজমাট সিরিজের এটি দ্বিতীয় পর্ব।

তৃতীয় ঘটনা ঘটে বিমান দুর্ঘ'টনার তিন বছর পর ১৯৬৬ সালে। বাসে সফর করছিলেন ফ্রানে। চাকা খুলে বাসটি নদীতে ডুবে যায়। যাত্রী অল্পই ছিলেন। তাদের মধ্যে ৪ জন ডুবে মা'রা যান। সৌভাগ্যবশত ফ্রানে সাঁতার জানতেন। তিনি সাঁতরে পাড়ে ওঠেন। সে বারও তিনি বিশেষ জ'খম হননি।

এই ঘটনার পর ট্রেন, বাস, বিমানে সফর বন্ধ করে দেন ফ্রানে। ঠিক করেন যেখানে যাবেন নিজের গাড়িতেই যাবেন। কিন্তু সেখানেও বিপদ। ১৯৭০ সালে ফ্রানে যখন গাড়ি চালাচ্ছিলেন তার গাড়িতে আ'গুন ধরে যায়। চলন্ত গাড়ি থেকেই ঝাঁপ দেন ফ্রানে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির জ্বালানির ট্যাঙ্কে বিস্ফোরণ হয়। তার চোখের সামনে পু'ড়ে ছাই হয়ে যায় গাড়িটি।

১৯৭৩ সালে আবার গাড়ি দুর্ঘ'টনার মুখোমুখি হন ফ্রানে। এ বার অবশ্য বিস্ফোরণ নয়। ফ্রানের গাড়ির জ্বালানি পাম্প ভেঙে ইঞ্জিন থেকে আ'গুনের হলকা বার হতে শুরু করে। আ'গুনের হলকায় ফ্রানের মা'থার চুল পু'ড়ে যায়। সামান্য উচ্চতার হেরফেরে তার শরীরটাও পু'ড়ে যেতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। আবারও কান ঘেঁষে বেরিয়ে যায় মৃ'ত্যু।

১৯৯৫ সালে রাস্তায় হাঁটছিলেন ফ্রানে। একটি বাস তাকে সজোরে ধাক্কা মা'রে। ছিট'কে নরম বালিতে গিয়ে পড়েন। বেঁচে যান ফ্রানে। ১৯৯৬ সালে তার গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে জাতিসংঘের একটি ট্রাকের। পাহাড়ি রাস্তায় ৩০০ মিটার গড়িয়ে পড়ে ফ্রানের গাড়ি। তবে গাড়ির ভিতর ফ্রানে ছিলেন না। গাড়িটি খাদে পড়ার মুহূর্তে ছিট'কে একটি গাছের ডালে আ'ট'কে যান তিনি।

ফ্র্যানের জীবন এখনও পর্যন্ত অবশ্য এটাই শেষ দুর্ঘ'টনা। তবে এত কিছুর পর ২০০৩ সালে ফ্রানে লটারি জেতেন। তখন তার বয়স ৭৩। ১১ লাখ ১০ হাজার ডলার জিতেছিলেন লটারিতে। এক দিনে কোটিপতি। লটারির টাকায় দু’টি বিরাট বাড়ি আর একটি বিলাসবহুল নৌকা কিনেছিলেন ফ্রানে।

তবে ২০১০ সালে তিনি হঠাৎই ঠিক করেন তার জেতা লটারির অধিকাংশ টাকা এবং তা থেকে কেনা সম্পত্তি আত্মীয় বন্ধুদের বিলিয়ে দেবেন। তার পর থেকে একান্তে অ'তি সাধারণ ভাবে জীবন কা'টাতে শুরু করেন ফ্রানে। শেষ বয়সে বিলাস ছেড়ে বাঁচেন নবতিপর বৃদ্ধ। সম্ভবত মৃ'ত্যুকে বার বার কাছ থেকে দেখে জীবনের আসল মানে খুঁজে পেয়েছেন তিনি। সূত্র: এবিপি।

Back to top button