জা’নেন কি কেন ইচ্ছে মতো টাকা ছাপানো যায় না

টাকা! যা ছাড়া জীবন অচ’ল। টাকার পিছনেই সারা দুনিয়ার মানুষের ছুটে চলা। অনেক হওয়ার পরও যা কম প’ড়ে যায়। আবার অনেকে দুঃখেরও অবসান হয়না এই টাকার জন্য।প্রশ্ন হচ্ছে কেন টাকা এত কম ছাপানো হয়? বেশি ছাপালেইতো আর কোন ক'ষ্ট থাকে না! “লা কাসা দে পাপেল” নামে স্প্যানিশ একটা টিভি সিরিজ বেশ শোরগোল তুলেছিল। এতে দেখে যায়, একদল ডা’কাত একটা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ঢুকে কিছু মানুষকে জি'ম্মি করে টাকা লুট করছে।

তবে তাদের লুট করার পদ্ধতি একটু ভিন্ন। তারা ব্যাংকের টাকা লুট না করে, বরং ব্যাংকের টাকা প্রিন্ট করার মেশিন ব্যবহার করে তৈরি করে নিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। এটা দেখার পর অনেকের এ প্রশ্ন মা'থায় এসেছে যে, তাদের মত সরকার নিজেই যদি বিলিয়ন-বিলিয়ন টাকা প্রিন্ট করে আমাদের হাতে তুলে দেয়, তাহলেই তো সব আর্থিক স’মস্যা মিটে যায়!

কিংবা, সরকার যদি বস্তা বস্তা টাকা প্রিন্ট করে পদ্মা সেতু, মেঘনা সেতু, বুড়িগঙ্গা সেতু তৈরী করে, তাহলেই বা স’মস্যা কোথায়?অনেক স’মস্যা! এত বড় স’মস্যার এত সহ'জ সমাধান হলে তো আর কোন চিন্তাই থাকত না।

চলুন জে’নে নেয়া যাক স’মস্যাটা কোথায়।নির্দিষ্ট করে বললে টাকা প্রিন্ট করার দায়িত্ব কে’ন্দ্রীয় ব্যাংকের। তো, সে কী'সের ভিত্তিতে টাকা তৈরী করে? সে কি মন চাইলেই যত ইচ্ছা টাকা প্রিন্ট ক’রতে পারে? টাকা উৎপাদন করার কোনো আবশ্যক নিয়ম নেই। যেকোনো দেশের সরকারের যত ইচ্ছে টাকা প্রিন্ট করার স্বাধীনতা রয়েছে। তবে কোনো দেশই যত ইচ্ছা টাকা প্রিন্ট করে না, টাকা প্রিন্ট করা হয় সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন অনুসারে তার স’ঙ্গে ভা'রসাম্য রেখে।

টাকা উৎপাদনের পরিমাণের স’ঙ্গে জ'ড়িত দেশের মানুষের উপার্জন, অর্থনৈতিক চাহি’দা, দেশের সম্পদ ইত্যাদি। এর বেশি উৎপাদন করলেই শুরু হয় স’মস্যা, দেশের অর্থনীতি ভা'রসাম্য হারাতে শুরু করে। ধ’রুন, একটা দেশে সম্পদ বলতে রয়েছে দশটা আম। আর সেই দেশ বছরে ২০ টাকা প্রিন্ট করে। পরিবহন খরচ, খুচরা মূল্য পাইকারী মূল্য ইত্যাদি জটিলতা বাদ দিয়ে ধ’রেই নেই প্রতিটি আ'মের মূল্য ২ টাকা।

তাহলে দেশের মোট সম্পদ আর মোট কারেন্সী ভা'রসাম্যপূর্ণ হল। পরের বছর ঐ দেশটি সর্বমোট ৪০ টাকা প্রিন্ট করল, কিন্তু মোট সম্পদ বলতে দশটি আমই রইল। যেহেতু দেশে নতুন কোনো সম্পদ নেই, ওই ১০টি আম কেনার জন্য বরাদ্দ হল ৪০টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি আ'মের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেল। এভাবেই দেশের মোট সম্পদের তুলনায় অ'তিরি’ক্ত টাকা উৎপাদন করলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়, টাকার দাম বা ক্রয়ক্ষ’মতা কমে যায়। একে বলে মূদ্রাস্ফীতি।

দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে বেশি করে টাকা ছাপিয়ে আর লাভ কি হল? তাই একটি দেশের কে’ন্দ্রীয় ব্যাংককে রীতিমত গবেষণা করে চাহি’দা নির্ধারণ ক’রতে হয়, সেই অনুযায়ী টাকা প্রিন্ট ক’রতে হয়। সাধারণত একটি দেশের জিডিপির ২-৩ শতাংশ টাকা প্রিন্ট করা হয়, তবে উন্নয়নশীল দেশে এই হার আরেকটু বেশি।এই কারণেই আম’রা ইচ্ছামত টাকা তৈরি করে রাতারাতি পদ্মা সেতু বানিয়ে ফেলতে পারি না।

তাহলে সেই বাড়তি টাকা শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, ডিলার, সাপ্লায়ার এবং আরো অনেকের হাত ধ’রে প্রবেশ করবে মূলধারার অর্থনীতিতে এবং এর বারোটা বাজিয়ে দেবে। মূদ্রাস্ফীতির কারণে বাড়তি অর্থ কা'টাকাটি হয়ে যায় কেবল তা-ই না, এর ফলে দেশের অর্থনীতির ভা'রসাম্য ভীষণভাবে ক্ষ’তিগ্রস্থ হয়। কী'ভাবে হয় সেটা জা’নেন কি? সঞ্চয়ের মূল্য কমে যাবে। আজকে ১০ টাকা দিয়ে চিপস না কিনে সেটা ব্যাংকে রাখলাম। এখন যদি দুইদিন পরে দেখি একটা চিপসের দাম ২০ টাকা, তাহলে তো সঞ্চয় ব্যাপারটা নিজে’র পায়ে নিজে কুড়াল মা’রা হল!

আম’রা অনেকেই ব'ন্ড কিনেছি বা কাউকে ব'ন্ড কিনতে দেখেছি। এই ব'ন্ডের মাধ্যমে আ’সলে সরকার আমাদের কাছে অর্থ ধার করে। আজকে পঞ্চাশ টাকার ব'ন্ড বিক্রি করে সেই অর্থ কাজে লা’গিয়ে এক বছর পরে সরকার পঞ্চাশ টাকা ফেরত দিচ্ছে, ব্যাপারটা এরকম। এখন, সরকারের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকার ব'ন্ড কিনলেন, এক বছর পর সেই টাকা আদায় করার পর যদি দেখেন মুদ্রাস্ফীতির কারণে পঞ্চাশ টাকায় আগের চাইতে কম পরিমাণ চাল কিনতে পারছেন, তখন স্বা’ভাবিকভাবেই ব'ন্ড কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

আবার ব'ন্ড বিক্রি না ক’রতে পারলে সরকারও প্রয়োজনীয় অর্থ থেকে ব’ঞ্চিত হবে। টাকার ক্রয়ক্ষ’মতার অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। ব্যাবসাখাতে অস্থিরতার সৃষ্টি হবে। যে দেশে মুদ্রাস্ফীতি হবে, সে দেশের মুদ্রার দাম অন্যদেশের মুদ্রার তুলনায় কমে যাবে। ধ’রুন, জার্মানীতে মুদ্রাস্ফীতির হার দিনে ২০%, আর ভা'রতে ০%। অর্থাৎ ১০০ টাকার একটি দ্রব্যের মূল্য কাল জার্মানীতে হবে ১২০ টাকা, ভা'রতে ১০০ টাকাই থাকবে।

সেক্ষেত্রে ভা'রতের এক রুপির মূল্য হবে জার্মানীর ১.২০ মা’র্কের (জার্মানীর মুদ্রা) সমান।জিম্বাবুয়ের অস্বা’ভাবিক মুদ্রাস্ফীতির কথা আম’রা জানি। সেখানে এক প্যাকেট পাউরুটি কেনার জন্য এক বস্তা টাকা নিয়ে দোকানে যেতে হত, এমন কথা প্রচলিত আছে।

কথাটা খুব একটা ভুলও নয়, বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন জিম্বাবুইয়ান ডলার সেখানে ডালভাত।এই অস্বা’ভাবিকতা শুরু মূলত ২০০৮ সাল থেকে। ষাটের দশক থেকেই জিম্বাবুয়ের অর্থনীতির নাজেহাল অবস্থা। একুশ শতকে এসে তা একেবারে চরম আ’কার ধারণ করে। অর্থনীতি সামাল দিতে মুগাবে সরকার প্রচুর পরিমাণে টাকা প্রিন্ট করার সিদ্ধা’ন্ত নেয়। এই সিদ্ধা’ন্ত উলটো ধ্বং’সের পথে নিয়ে যায় জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিকে। প্রচুর পরিমাণে টাকা ছাপা হওয়ায় হু-হু করে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে। বর্তমানে জিম্বাবুয়ের মুদ্রাস্ফীতির হার দৈনিক ৯৮%, অর্থাৎ আজকে যার মূল্য ১০০ টাকা, আগামীকাল তা ১৯৮ টাকা দিয়ে কিনতে হবে! চিন্তা করা যায়!

তবে মুদ্রাস্ফীতির সর্বো’চ্চ হার কিন্তু এটা নয়। এই অ'প্রীতিকর রেকর্ড হাঙ্গেরীর, ১৯৪৬ সালে সে দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার দৈনিক ১৯৫% পর্যন্ত উঠেছিল।অ'তিরি’ক্ত ছাপা হওয়া টাকা দিয়ে যে দেশের ঋণই শোধ করেন, যে দেশেই তা খরচ করেন, তা ঘুরেফি’রে আবার নিজে’র দেশেই ফেরত আসবে। কারণ আমাদের দেশের মুদ্রা তো শেষতক আমা’র দেশের মানুষকেই গ্রহণ ক’রতে হচ্ছে, অন্যান্য দেশে তো এই মুদ্রা দিয়ে কেনাকা'টা ক’রতে পারছেন না! সুতরাং

বাড়তি টাকা'টা ঘুরেফি’রে আমাদের দেশের অর্থনীতিতেই প্রবেশ করছে। আরেকটা গু’রুত্ব পূর্ণ কথা হল এই টাকা কিন্তু সরাসরি বৈদেশিক ঋণ শোধ করায় ব্যবহার ক’রতে পারছি না, কারণ ঋণের চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট কারেন্সীতে তা শোধ করার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা থাকে। একটা দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ক’রতে বেশি করে টাকা তৈরি করা কোন সমাধান নয়, সমাধান হল উৎপাদন বৃ’দ্ধি করা। এর ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষ’মতা বাড়বে। উল্টোভাবে উন্নয়ন ক’রতে গেলে উন্নয়নও উল্টোভাবেই হবে!

Back to top button